Home|Blogs|Bio-Graphy| Works| Books|Poetry|Rhymes|Short-Stories|Column|Gallery|Voice of Humanity

শিকার

শিকারে শিকারে বেলা গড়িয়ে যাবার কথা মনে পড়লেই রেহানার শরীর শিউরে ওঠে। শৈশবের সেই অস্থিরতায় তার কপাল চূয়ে বৃষ্টি ঝরে। রেহানা ভাবতেই পারে না, দৃষ্টিরমুখর নিস্তব্ধতায় কেন মাছরাঙার একটিও ব্যর্থ শিকার ছিল না।

জীবনের পর্বে পর্বে কোন না শিকারীর আগমন ঘটে সুস্বাদু সময় শিকারে। শিকারী তার স্থিরদৃষ্টিতে অপেক্ষার দৃঢ়তা সাজায়। শূন্য হাতে ফেরা শিকারীর নীতি নয়। অন্যের কাছ থেকে কিছু না পেলে আত্মাগ্রসনেও তার চেষ্টা প্রাণান্ত। শিকার এবং জীবন, কে কার সমার্থক তাও জানে সে। কেবল বস্তুতে যা সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রবাহিত হয় রক্ত-মাংসের অনু-পরামানুতে। শিকারের মুখোমুখি যে জীবন সে জীবনের প্রাপ্তমূল্য আনন্দ না-কি মৃত্যু? হতে পারে ব্যর্থতার মূল থেকে সফল অঙ্কুরোদগমে লাল টুকটুকে গোলাপের মতো ফুটেওঠা।

হতে পারে সেই ফুল ঝরে পড়ার আগে গ্রহণের জন্য মাটির আরও এক উর্বর প্রস্তুতিপর্ব।

জীবনঘনিষ্ট এমন প্রশ্ন-প্রশ্নান্তরের মুখোমুখি হয়ে রেহানার ভাবনার কোন শেষ নেই। ভাবনা আরও গাঢ় হয় যখন সে ভাবে, মাছরাঙা যখনই পানিতে ঠোঁট চুবিয়েছে তখনই ঠোঁটে সে মাছ দেখেছে। ছোট্ট ছোট্ট রুপোলি মাছ যেনো জলের শরীর থেকে তুলেআনা একটি তরতাজা জীবন যার মৃত্যু নিশ্চিত, সেই দৃশ্যপট তাকে সবসময়ই অন্যরকম ভাবনায় ফেলেছে। জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি দৃশ্যমান লেজের নড়াচড়া বারবার তার বুকে গেঁথে দিয়েছে অন্যরকম অস্থিরতা।

মাছরাঙার প্রতিটি শিকারের অধ্যায় তার নিজের কাছে একএকটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে গেছে। দিনের পর দিন সে ভাবতে বাধ্য হয়েছে, শিকারের সময় মাছই কী মাছরাঙার ঠোঁটে আত্মসমার্পণ করে, জলজ জীবনের ঘৃণায় নিজেকে বিপন্ন করে; নাকি অন্যের ক্ষুধা নিবৃত্তি আর অনাগত আনন্দের উতস হতে চায়।

মাছরাঙা যে ডালপালার ওপর বসে লক্ষ্য স্থির করতো, তার নীরব সমর্থনে তখন রেহানার এক ধরণের ভালোলাগা ছিলো। গাছটি ইচ্ছে করলে কি প্রতিবাদ করতে পারতো? না-কি গাছই ভেতরে ভেতরে শিকারে পরিণত হয়ে যেতো? কিংবা যখন মাছরাঙাটি মাছের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে তখনই তো একটি অনাকাংখিত শব্দ হতে পারতো, প্রাণের ভয়ে মাছটি পানির খুব নিচে হয়তো বা ডুব দিতে পারতো।

শিকারে একবার ব্যর্থ হলে মাছরাঙার চেহারা কেমন হয় তা কখনোই দেখা হয়নি রেহানার। অথচ ব্যর্থতার ভাষা তার জানা দরকার। ব্যর্থতার পর্ব-পর্বান্ত কী ধূসরতায় আচ্ছন্ন, না-কি সুখ-অসুখের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে কোন চীতকারের সাথে মিশে যাওয়া; শিকারী শিকার করবে তাতে বাঁধা দেবে কে? শিকারীর তো কোন মানবিক প্রান্ত নেই, গণ্ডিবদ্ধ সময় নেই, শুধু আইন করে যাকে বেঁধে রাখা যাবে।

শিকার আর মাছরাঙার ভাবনার ভেতরে রেহানার মনে, শিকার নিয়ে একটি উতসুকাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিলো। সে যখন খেতে বসতো, থালায় মাখানো ভাত থেকে মুঠোতে ভরেআনা ভাতের একটিও সে মাটিতে পড়তে দিতো না, একসাথেই মুখের ভেতর ঠাসা একমুঠো ভাত ভরতে না পারলে তার ভালই লাগতো না। কাউকে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে হলে পাঁচটি আঙুল যাতে সমান স্পর্শ পায় সেদিকে তার বরাবরই খেয়াল থাকতো।

বাবা, মা’র দিকে তাকালে সম্পূর্ণ তাকাচ্ছে কি-না, অথবা চোখের ভাষায় অন্য কিছু প্রাপ্তির ভাষা আছে কি-না, থাকলে তার পরিমাণ কতটুকু, সেই কৈশোরেই এসব নিয়ে তার ভাবনার শেষ ছিলো না। আর একটু বেড়েওঠা সময়ে কেউ তার দিকে তাকালে নিজেকে পরিপূর্ণ মেলে ধরতে ইচ্ছে হতো তার। মাছরাঙার মাছ শিকারের অধ্যায় থেকে নিজেকে মুক্ত করা ছিলো তার পক্ষে অসম্ভব। আবার এরকটু বেড়ে সে ঠিকই বুঝতো ইচ্ছে হলেও নিজেকে খোলাখুলি মেলে ধরা সম্ভব নয়।

মজাপুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকায় তখন সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা। পুকুর পাড়ে একা একা মাছরাঙার মাছ শিকার দেখা চূড়ান্ত বারণ। অথচ সে নিজেই তখন মাছ কিংবা মাছরাঙার অস্তিত্বেই প্লাবিত।

শরীরদীঘিতে শুধু মাছ আর মাছ, সোনালি রুপোলি মাছ, দিন-রাত যার লেজের নড়াচড়া, কষ্ট-সুখ-যন্ত্রণা নিয়ে নিজের অজান্তে সত্ত্বার ভেতরে সাঁতরে যাওয়া মাইল মাইল গুমোট-আগুন সময়, পায়ের নিচ থেকে হ্যাঁ সরে না না না জেকে বসেছে অকস্মাত।

যৌবনে হঠাতই একটি সামাজিক বাঁধা তাকে আষ্টে-পিষ্টে বেঁধে ফেলেছে। গোড়ালির ওপরে কাপড় উঠলে মায়ের বকুনি, নাভির নিচে কাপড় নেমে গেলে মায়ের রক্তচোখ, বুকের চারপাশ খামছে ধরা মায়ের কড়া নির্দেশ, হাসি থেকে ঠোঁটের ফাঁকে দাঁত বের হলেই মায়ের বকুনি, ঠোঁট একটু কাঁপলেই যেনো কোন সর্বনাশ!

কোন মানুষ কী কোথাও স্থির হয়ে বসে আছে মাছরাঙার মতো তার শরীরে ঠোক্কর দিতে? মাছরাঙার মতো দুই ঠোঁটের মাঝখানে তার কাঁপা কাঁপা ঠোঁট দু’টি চেপে ধরতে? মানুষ ইচ্ছে করলেই তো সবকিছু করতে পারে না! মায়ের ব্যবহারে রেহানা আত্মসিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িতে বাধ্য হয় বারবার।

তবু যেন মুক্তি নেই, মানুষ নিজেকে ভেঙে ভেঙে তার রক্তাক্ত টুকরোগুলো অন্যের শরীরে ঢুকিয়ে দেয়। রেহানা নিজেই এই বাস্তবতায় একাত্ম হয়ে ভেবে পায় না রাতে তার পাশের ঘরে ঢুকেই রফিক ভাই হঠাত কেন এতো ব্যস্ত হয়ে ওঠে?

বড়আপা যত বলে- ‘এতো ব্যস্ততা কিসের? সবকিছুরইতো একটা ব্যকরণ আছে কিন্তু রফিক ভাই তার ব্যস্ততায় কতটুকু বাড়ে কিংবা কমে তা তো ছোট হয়ে বড় বোনের কাছ থেকে জানা সম্ভব নয়।

তবে রেহানা তার জীবন থেকে বুঝতে পারে, রফিক ভাই কখনো মাছরাঙার মাছ শিকার দেখেনি। বাঁশঝাড়ের নিঃস্তব্দ সুনসান শব্দের ভেতর হঠাত টুপ শব্দের সঙ্গে পরিচিত নয়। তাই স্থির না হলে জীবনের প্রথম পর্বে শিকারীর মর্যাদা পাওয়া সম্ভব হয় না সেটি বড় বোনকে প্রশ্ন করে জানার প্রয়োজন হয় না।

বড়আপাও স্থির কিনা সেটিও তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রস্তুতির ব্যস্ততা নিয়ে স্থির হবার ভান করা যায় কিন্তু শিকারের প্রাপ্তি যে শূন্যই থেকে যায়, একজন বোদ্ধা শিকারদর্শক হিসেবে এ প্রশ্ন সে নিজের কাছে করতেই পারে। নিজেকে অনায়াসে বলতে পারে- আপা দুলাভাইয়ের চেয়ে সে তো সেই মুহূর্তে অনেক স্থির, যতেষ্ট ব্যকরণসম্মত মাত্রাসম্বৃদ্ধ শয়নরীতিতে আছে কিন্তু তার কাছে কোন শিকারীর অস্তিত্ব কেন নেই।

পৌষমাসের প্রথম দিনে তাকে দেখতে এসেছিলো পাশের গ্রামের দবির মোল্লা, ছেলের বিয়ের জন্য। ছেলে শফিক, মেয়েদের স্কুলে পড়ায়। শফিককে সে আগে দেখেছে কিন্তু শিকারীর কোন হাবভাব তার মধ্যে কখনই খুঁজে পায়নি। খোঁজার চেষ্টা করেনি তা-ও নয়। কিন্তু নিরর্থক একটি শব্দ ছাড়া আর কিছুই মেলেনি তার শিকারী মনে।

মনের ভেতরে এতো এতো মাছের ভেতরে তার সাঁতার প্রতিদিন, এতো শিকার, মাছ হয়ে বসে থাকে অথচ তার দৃষ্টি থেমে আছে নিজের ছায়ায়- যাকে ঠোঁটে চেপে ধরা যায় না। কত সহজেই সে বুঝতে পারছে, শফিকের চেয়ে শফিকের বাবাই উত্তম শিকারী। তাকে দেখার ফাঁকে ফাঁকে কখনো চুল শিকার, কখনো ঊরু শিকার, কখনো বুক শিকার- যেন বর্ষিয়ান মাছরাঙা অন্তত লক্ষ মাছে শিকারের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। মাছরাঙার স্থির ঠোঁটের মতো যেনো তার শিকারের অপো। শফিকের বাবা মাছরাঙার আদলে একটি রিহার্সেল সেরে সব শেষে যখন বারান্দা থেকে সে ঘরে ফিরে যাচ্ছে তখন পিছন শিকারের ব্যস্ততা তাকে প্রায় শফিকের মতো তরুণ শিকারীকে ভুলতে প্রায় বাধ্য করেছিলো।

দবির তার ছেলেকে নিশ্চয়ই বলবে, ‘পেটভরে খেতে পারবে, মাছরাঙার মতো স্থির থেকো ব্যকরণ মেনো আর ডুবযাত্রার টাপুরটুপুর মন্ত্রটা শিখে নিও; কিতাব আমার কাছেই আছে তোমার মায়ের বালিশের নিচে।’

মাছ হিসেবে রেহানা পরীক্ষায় পাশ। দবির মোল্লার রেহানাকে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বিয়ের আগে রেহানা একবার শফিকের সামনে মাছ হয়ে বসতে চায়। অন্তত শিকারের আগে তার স্থির হয়ে থাকার বিষয়টি পরখ করে দেখার জন্য, তা কি সম্ভব?

বিয়ের দিন স্থির হয়ে গেলো। এর মধ্যেই মা তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে তো জানে বিছানায় কেমন করে ভেসে থাকতে হবে। কেমন করে স্থির থাকতে হবে। সে তো মাছরাঙার কাছ থেকে তা আগেই শিখেছে। শফিক শিকারে অপরিপক্ক হলে সে-ই তো তাকে সাহায্য করতে পারবে। ছুঁয়ে দেবার ব্যর্থতায় তাকেই শিখিয়ে দিতে পারবে কেমন করে হাত বাড়াতে হয়। কেমন করে পাঁচটি আঙ্গুলের নামতা পড়তে হয়।

রফিক ভাই স্থির হতে পারিনি, আপা স্থির হতে পারিনি, সে কি পারবে? যৌবনের প্রথমেই সেতো মফিজের সাথে মিশেছে। মাছ হবার চেষ্টা করেছে। ফলও পেয়েছে! তার বিশ্বাস শিকারের অভিজ্ঞতায় সিক্ত হতে না পারলেও মফিজের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে আসতে বাধ্য। আজ সে স্থির হয়েই শিকার করতে পারবে কিংবা শিকারে পরিণত হতে পারবে।

জীবনের প্রথম শিকারের সময় মাছরাঙার ব্যস্ততা ছিলো কি-না তার জানা নেই। জানা থাকলে প্রাপ্তির খাতায় বাড়তি কিছু জমা করতে পারতো কি-না তাও এখন বুঝতে পারছে না। কিন্তু এখন ভেবে আর কী লাভ? প্রথমে তাকে তো মাছ হতেই হবে। ভেসে থাকলে তো পাখার নড়াচড়া থাকবেই তারপর ঠোঁটের দৈর্ঘ্যপ্রস্থ আর নড়াচড়ার ধরণ বিবেচনা করে মাছরাঙার কাহিনীর কাছে অবশ্যম্ভাবী প্রত্যাবর্তন।

প্রথম রাতে স্থির হয়ে রেহানা যখন নিজেকে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছিলো, তখন তো ভালোলাগার কথা, প্রস্তুতির সময় ভেবে আনন্দ পাবার কথা, কিন্তু তখন ভালো লাগলো না কেনো? এপাশ-ওপাশ ব্যস্ততা কেনো এতো বেড়েছিলো? মাছরাঙার প্রস্তুতি দেখে কেনো তার শফিকের প্রস্তুতিপর্ব দেখতে ইচ্ছে করছে না! কেনো বুঝতে পারছে না শিকারে পরিণত না হলে শফিক তাকে ঠোঁটের ফাঁকে কেমন করে মাছের মতো চেপে রাখবে প্রশ্রয়ের প্রথম পর্যায়ে?

মাছরাঙার ফর্মূলা কি ব্যর্থ? সত্যিই কি মাছ হয়ে তাকেই ধরা দিতে হবে মাছরাঙা শফিকের কাছে। সে এখন বুঝতে পারছে, মাছকে কখনো কখনো মাছরাঙার কাছে ধরা দিতে হয়। ঠোঁটে চেপে ধরার আগেই নিজস্ব ঠোঁটের আত্মসমর্পণ করাতে হয়। দুঃখ কিংবা আনন্দ মাঝামাঝি সেটুকু সময় ঠোঁটের ফাঁকে চেপেথাকা ততটুকুই বাড়তি সুখ।

বিয়ের পর প্রথম দেখায় মা রেহানাকে জিজ্ঞেস করেছিলো,

কোন অসুবিধা হচ্ছে রেহানা?

কিন্তু সে বলতে পারেনি- না, না; অসুবিধা নেই মা, আমি নিজেই মাছরাঙা হয়েছি। একটি মাছও আমার ইচ্ছার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে যেতে পারছে না।

আমি এখন মাছের মাথা খাচ্ছি, চোখ খাচ্ছি, কানকা খাচ্ছি, ফুসফুস খাচ্ছি, লেজ খাচ্ছি। কিন্তু মা, এই রুপোলি মাছের কোন অংশই হজম হচ্ছে না। প্রতিদিন একটি বড় মাছ আমার বুক চিরে বের হয়ে পুকুরের স্থির পানিতে নেমে যাচ্ছে।