Home|Bio-Graphy| Works| Books|Poetry|Rhymes|Short Stories|Column|Recital|Gallery|Contact

শেখ নজরুল

মাটি, মানুষ আর মানবতা যাঁর কবিতার বিষয়বস্তু তিনি তো চিন্তা-চেতনায় মানুষের অধিকারকেই প্রাধান্য দেবেন সর্বাগ্রে এবং সেটিই সঙ্গত। শেখ নজরুল নিজেকে লেখালেখিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একটি স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে। ছন্দ সচেতন কবি হিসেবেও তিনি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন দ্রুত। তাঁর বাবা মরহুম নূরুল ইসলাম ছিলেন স্কুল শিক্ষক, মা রাশীদা বেগম অন্তপুরের বাসিন্দা। জন্ম সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার জগন্নাথপুর নামের এক অজপাড়াগাঁয়।

১৪ বছর বয়সেই কবিতা লেখা শুরু হলেও একটি জীবন বৃত্তান্ত এবং একাধিক মৃত্যু শীর্ষক প্রথম কবিতাটি প্রকাশিত হয় দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় ১৯৯৭ সালে। প্রকাশিত গ্রন্থ ২৪। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ যতক্ষণ তুমি মাধবী ...। সর্বশেষ প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ বৃষ্টিকাব্য। উল্লেখযোগ্য বই : কবিতা- পাঁজরের মানচিত্রে অনেক নদী, কষ্টের অনুবাদ, মা ও জোনাক তারার কাব্য, অষ্টধাতুর মাদুলি, আমার খুনের তালিকায় জোছনাও আছে, মলাটবন্দি চেতনার কফিন,  মেঘ সম্পাদনা। ছড়া- কার ঘাড়ে কে চড়ে, ফন্দিফিকির, কাঠমোলা, রাজনীতি এ্যাটরেট জনগণ ডটকম, বুকের ভেতর বাংলাদেশ, বৃষ্টিকাব্য, বন্ধুকাব্য, মুঠির ভেতর আগুন ঝরে কার, সময়ের কাব্য। গল্পগ্রন্থ- গ্লাসভাঙা দুপুর। যতক্ষণ তুমি মাধবী তাঁর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশকাল একুশে বইমেলা ১৯৯৭। গ্রন্থটিতে ৪৩টি কবিতা স্থান পায়। এই গ্রন্থের একটি কবিতা ভিন দেশে চলে একদিন-এ তিনি লিখেছেন এই বাংলার নদীতে বহমান যে জল/সেই জলের আজ বিপরীত ধারা/সেই সব মানুষ বিশ্বাসঘাতক/সেই মাটি উপেক্ষা করে ফসলের আবাদ/মাধবীর বুকে দেখি নিষিদ্ধ সন্তান ...। এ রকম একটি প্রতিবাদী কবিতার সাথে আবার তিনি অনায়াসে লিখেছেন- কাছে এসো নারী/নিবিড় স্পর্শ কর শীতল শরীর/তোমাকে নির্মাণ দিয়ে শুরু হোক স্থাপত্যের সুনিপুণ যাত্রা/সভ্যতা দেখুক দু’চোখ মেলে/কী অনায়াসে ভেতরে ভেতরে/পোড়ামাটির বুকে সবুজ বিছানা ...। আবার সামাজিক অবক্ষয়ে তাঁর প্রথম প্রতিবাদটি ছিল এ রকম- ...বীজের মধ্যে লুক্কায়িত বীজ/সেও দেখি উত্তর জন্মে অক্ষম/অন্ধ মানুষগুলি হামেশাই ঠোক্কর খায় পথে পথে/সাদাছড়ি নিয়ে যায় কোনো নির্মম পণ্ডিত/লিখলেই দেখি কবিতা এখন অন্ধ গলির দাগী মাস্তান ...। গ্রন্থটি শেখ নজরুলের প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলেও এটির বিষয় নির্বাচন এবং শব্দ ব্যবহারের বৈচিত্র্য পাঠকমহলে ব্যাপক পরিচিতি পায়। পাঁজরের মানচিত্রে অনেক নদী শেখ নজরুলের প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এটি প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭-এ। গ্রন্থটিতে কবির ষাটটি কবিতা স্থান পায়। বিষয় বৈচিত্র্যে তাঁর দ্রুত সমৃদ্ধতা এই গ্রন্থটি পাঠ করলেই অনায়াসে অনুধাবন করা যায়। গোপন মাধুর্য কবিতাটি তিনি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- সঙ্গোপনে ভেঙে যাওয়াই ভালো/নিঃশব্দে ভেঙে গেলে স্মৃতি হয় মূর্তমান/তিক্ততার লোনা স্বাদে মাধুর্য গচ্ছিত হয় অবলীলায়/ভ্রূণ লুকোনো বীজের গভীরে মাটি ফুঁড়িয়ে উঠে আসে তার সবুজ কোমলতা/আগুন তেমনি রক্তকণায়/জন্মের প্রতীক্ষায় যে নীরবতা/তাই ভেঙে হয় কান্নাকাটি ...। তাঁর অবস্থান সর্বদাই যে যুদ্ধের বিপক্ষে তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় এবার শান্তি চাই কবিতায়। এখানে তিনি লিখেছেন- আর যুদ্ধ নয় এবার শান্তি চাই/শান্ত সৌম, কাশফুলের মতো শুভ্র শান্তি/পায়রার দুটি পাখার মতো শান্তি চাই/রজনীগন্ধার সুঘ্রাণের মতো শান্তি ...। উল্লেখিত দুটি গ্রন্থের সাফল্যের ধারায় ১৯৯৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ নিষিদ্ধ নমস্কার। এই গ্রন্থে তাঁর নব্বইটি কবিতা স্থান পায়। বিষয় বৈচিত্র্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ঋদ্ধতায় অনন্য এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা।দেশ ভিন্ন হতে পারে, মানুষের মানসিকতা ভিন্ন হতে পারে, দুটি দেশের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া উঠতে পারে কিন্তু তিনি সেই কাঁটাতারে দুই দেশের মাটি থেকে জন্ম লতাগুল্মের পারস্পরিক ভালোবাসাকে বর্ণনা করেছেন এভাবেই- কাঁটাতারে বিভক্ত ফাঁসফাঁস জালে/বেড়ে ওঠে দু’দেশের লতাগুল্ম/কখনো ফুলে ফুলে পারস্পরিক আলিঙ্গন/মানুষ এসব ভালোবাসার গল্প জানে না ...। স্বদেশের ভালোবাসায় তাঁর অবস্থান অনড়। তিনি সেই প্রমাণ রাখতে চেষ্টা করেছেন শুধু মৃত্যু ছাড়া এইসব জানাজানির মৃত্যু নেই কবিতায়- এই এখানে নিজস্ব মাটিতে দাঁড়ালাম পারলে সরাও/এই খসখসে কান টান টান করে দাঁড়ালাম পারলে ধর/যে মাটি আমার পিতা কিংবা পিতামহের সে তো বহন করবেই আদিম অকৃত্রিম ভালোবাসা/শুধু মৃত্যু ছাড়া এসব জানাজানির মৃত্যু নেই .../। এই গ্রন্থে তিনি স্বাধীনতাকে চিহ্নিত করেছেন একটু ভিন্নভাবে। তাঁর ভাষায়- কষ্ট- একগুচ্ছ রজনীগন্ধার নাম নয়/কষ্টের নাম হতে পারে ময়লা পোতার মোড়/কিংবা নিরালা হাউজিং এস্টেটের পাশে ময়লা ড্রেন/হতে পাগলা কানাই লালের যুবতী মেয়ের যাপিত জীবন/কিংবা বস্তির মেয়ে কামেলার বেনামী গর্ভধারণ/কষ্ট- বাগান বিলাসের বিলাসিতা হতে পারে না ...।

কবিতার পাশাপাশি শেখ নজরুল হঠাৎ করেই যেন ছড়া রচনায় মনোযোগী হন এবং এর সাথে সাথে ছন্দের প্রতি তাঁর আরও বেশি একাগ্রতা লক্ষণীয়। এ সময় অর্থাৎ ২০০০ সালের বইমেলায় প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম ছড়াগ্রন্থ কার ঘাড়ে কে চড়ে। এই গ্রন্থে ষাটটি ছড়া স্থান পায়। ছড়া রচনার বিষয়বস্তু হিসেবেও তিনি সামাজিক অবক্ষয়, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বেছে নেন। শিরোনাম শীর্ষক ছড়ায় তিনি লেখেন- কার ঘাড়ে কে যে চড়ে/রাজা বাবু পড়ে পড়ে/ধরে কষে কে রে/কুঁজো কুঁজো ঘাড় যার/সেই বাকী আছে আর/রাজা বাঁচাতে রে!

২০০১ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় যুদ্ধের কবিতা নিয়ে কাব্যগ্রন্থ বারুদের কঙ্কাল। এই গ্রন্থে তাঁর ৪০টি কবিতা স্থান পায়। কবিতাগুলির প্রত্যেকটিই যুদ্ধ বিষয় নিয়ে রচিত। এই গ্রন্থের জেগে ওঠো বাংলাদেশ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন- জেগে ওঠো বাংলাদেশ/জেগে ওঠো এই ফালগুনে/বাসন্তি শাড়ির রাতজাগা ভাঁজে/জেগে থাকো তুমি/পলাশ রাঙানো থোকা থোকা রক্তে/ভীষণ মুগ্ধতা জেনে নিতে পারো আজ ...। যুদ্ধের ভয়াবহতার বিষয়টি তিনি যুদ্ধ করবে কোথায় বন্ধু কবিতায় এভাবে তুলে ধরেছেন- ...যুদ্ধ করবে কোথায় বন্ধু/চারপাশে দেখি ধু ধু বালুচর/নোঙর ফেলবো কোথায় বন্ধু/নদী হয়ে গেছে আমাদের পর ...।

পরপর তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশের পর কিছুটা বিরতি। নিজেকে নতুন করে আবার প্রস্তুত করে রচনা করেন ছড়াগ্রন্থ ফন্দি ফিকির। গ্রন্থটি ২০০৩ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশ পায়। গ্রন্থটিতে মোট ৪০টি ছড়া স্থান পায়। ছড়ার বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বরাবরই রাজনীতি, সমাজের অবক্ষয় এবং সমসাময়িক বিষয়েই আলোকপাত করেছেন। সরকারী টেলিফোন শীর্ষক ছড়ায় তিনি কটাক্ষ করেছেন এভাবে- টেলিফোন সরকারী বিল দেবে সরকার/যত খুশি কথা বলো থামা নেই দরকার/বিড়ালের জ্বর কতো এলো কোন ডাক্তার/রিং দিয়ে জেনে নাও আছে কি না বাক তার ...। এমনি কটাক্ষধর্মী ছড়াগুলি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

একই সালের একুশে বইমেলায় তাঁর কষ্টের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায়। ৫৬টি কবিতা দিয়ে সাজানো হয় এই গ্রন্থের অবয়ব। এবং কষ্টের অনুবাদ গ্রন্থটি সুধীজনের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। চলমান ধারায় ছন্দবদ্ধ জ্ঞানে কবিতা রচনায় তাঁর দক্ষতা প্রবলভাবে এই গ্রন্থটিতে প্রকাশ পায়। এই গ্রন্থে গন্ধমের সাথে যুদ্ধ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছেন- অতৃপ্ত অন্তর জ্বলে গণেশের লুকোনো যৌবনে/হায় কলাগাছ বউ তুমি কার মেটাবে সঙ্গম/একগুচ্ছ গোলাপের কান্না শুনি মানুষের ঘরে/বার বার শিব গড়ে খুঁজে পাই বানর শরীর...। এই গ্রন্থের মা আর অঞ্জনা তিলক বিশ্বাসী নারী কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং আবৃত্তিশিল্পে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে নেয়। .. শ্রমিকের রোদে জ্বলা ত্বকে/মজুরের ফোসকা পড়া হাতে/যাবতীয় ভাগ্য রেখা আর সেই স্বপ্নটি লোক পলাতক/দৃশ্যমান পড়ে আছে শুধু খসখসে হাতের গহ্বর .../মা আর অঞ্জনা তিলক বিশ্বাসী নারী/এতো কিছু বহমানপরাজয়  রেখে/এখনো খুঁজতে চায় কপালের মাঝখানে/আরও এক রক্ত তিলক সুখ যার নাম। কবিতা রচনার সমৃদ্ধ চেতনায় ২০০৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর তিনটি গ্রন্থ- অষ্টধাতুর মাদুলি (কাব্য); কাঠমোলা (ছড়া) ও ভয়েজ অব হিউম্যানিটি (ইংরেজিতে অনূদিত) অষ্টধাতুর মাদুলি কাব্যগ্রন্থটি প্রকৃতপক্ষে তাঁর ইতিপূর্বে প্রকাশিত ৮টি কাব্যগ্রন্থের বাছাইকৃত কবিতার একটি বড় সংকলন। এখানে কবির প্রায় ৩০০ কবিতা স্থান পেয়েছে। গাঢ় ও রূঢ় বাস্তবতা এবং সামাজিক সমস্যার বিষয়টি প্রতিধ্বনিত হয়েছে অত্যন্ত জোরালোভাবে। কবিতার অন্তর্গত বোধ, ছন্দে তিনি যে অন্য কবিদের চেয়ে স্বতন্ত্র তা এক নজরে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এ সংকলন গ্রন্থটিতে। এই গ্রন্থটির সংকলনে কবির কিছু সামপ্রতিক কবিতা স্থান পেয়েছে। তার মধ্যে হবে, কিন্তু কবে কবিতাটি পাঠককে আলোড়িত করেছিলো- হবে/সব কিছু হবে/হবে অর্থ প্রতিপত্তি/হবে নাম যশ খ্যাতি/হোক না এক রত্তি/হবে?/কিন্তু কবে?

কাঠমোলা শীর্ষক ছড়াগ্রন্থের কাঠমোলা শীর্ষক ছড়াটিতে তিনি উগ্র ধর্মান্ধদের চিহ্নিত করেছেন এভাবেই- বাবা ভাবে ছেলে গেছে গোলায়/তারও বেশি বলে কাঠমোলায়/আদবের কোনো কিছু শেখে নাই/আমপারা ধরে আর টেকে নাই/যারা বীজ বুনে যায় ফতোয়ার/সেই বাণী শুনবে সে কতো আর/পাঁচবার নামাজের মসলায়/বার বার হাত যারা কচলায়/এই কাজ করে কেউ পাপ ছাড়া/মৌলভী হবে কেনো মাফ ছাড়া ...।
ভয়েজ অব হিউম্যানিটি অনুবাদ গ্রন্থের বাছাইকৃত কবিতাগুলির অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আফতাব হোসেন। বাংলাদেশের কবিতাকে অন্যান্য ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছে দেবার মাধ্যম হিসেবে এই গ্রন্থটি একটি অন্যতম সেতু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে সব মহলেই।

২০০৫ সালের একুশে বইমেলায় কবির আমার খুনের তালিকায় জোছনাও আছে শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ এবং  রাজনীতি এ্যাটরেট জনগণ ডটকম শীর্ষক ছড়াগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
আমার খুনের তালিকায় জোছনাও আছে কাব্যগ্রন্থটিতে ৭২টি কবিতা স্থান পেয়েছে। যার প্রতিটি কবিতায়ই কবির কবিসত্তার ব্যাপক উপলব্ধি পাঠক দরবারে উপস্থাপিত হয়েছে। এই গ্রন্থটিতে কবি কবিতার ভাঙাগড়া নিয়ে একটি খেলায় অবতীর্ণ হয়েছেন। পুরুষ শীর্ষক কবিতাটির উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে- যে পুরুষ ভাঙে তোমার রাতের নীরবতা/সেই পুরুষই অন্য চিবুক খরচ করে/যে পুরুষ চাষ করেছে তোমার শরীর/সেই পুরুষই ফসল ফলায় অন্য ঘরে ...। আর রাজনীতি এ্যাটরেট জনগণ ডটকম শীর্ষক ছড়াগ্রন্থটির নামকরণের চমৎকারিত্বে এর বিষয়বস্তু কি হতে পারে তা পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারবেন। তবুও ক’টি ছত্র উল্লেখ না করলেই নয়- রাজনীতি এ্যাটরেট জনগণ ডটকম/আমাদের মাথা আর কবে হবে হট কম/রাজনীতি এ্যাটরেট জনগণ ডটকম/সরকারি দালানেতে কারা দেয় রড কম ...।

প্রতিটি গ্রন্থ পাঠকের গ্রহণের ব্যাপকতায় ২০০৬ সালের একুশে বইমেলায় কবির ৪টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই প্রথম ১৮টি গল্প নিয়ে প্রথম কবির গল্পগ্রন্থ গ্লাসভাঙা দুপুর পাঠকের দরবারে উপস্থাপিত হয়। জানালাজীবন, মাছরাঙা, রাতের গল্প, দৌড় প্রভৃতি গল্পগুলির বিষয়বস্তু পাঠককে একটি ভিন্ন স্বাদ গ্রহণের সুযোগ এনে দেয়।

বুকের ভেতর বাংলাদেশ শীর্ষক নির্বাচিত ছড়াগ্রন্থটি মূলত তাঁর বাছাইকৃত ছড়ার একটি সংকলন। যেখানে বোমা বায়োস্কোপ, বুকের ভেতর বাংলাদেশ, হাততালি, মফিজ, সোনাঝরা সেই দিন-এর মতো প্রায় ১০০টি বিশেষ ছড়া স্থান পেয়েছে। প্রতিটি ছড়ার সমৃদ্ধতা ছড়াকার হিসেবে শেখ নজরুলকে অবশ্যই অন্যান্য ছড়াকার থেকে পাঠকের কাছে যে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে তা বুকের ভেতর বাংলাদেশ শীর্ষক ছড়াটি পাঠে সহজেই অনুমেয় হয়- ফাগুন জ্বলে আগুন চোখে/ভালো থাকার সময় শেষ/খুব গোপনে তাই রেখেছি/বুকের ভেতর বাংলাদেশ ...। ২০০৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত বাকি দুটি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে- মলাটবন্দি চেতনার কফিন  এবং মীমাংসিত মৃত্যু অমীমাংসিত জীবনে। যেখানে কবি তাঁর কবিসত্তার উত্তরোত্তর সমৃৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। ২০০৭ সালে বই মেলায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- মেঘ সম্পাদনা, পদ্যগ্রন্থ- সময়ের কাব্য। সময়ের কাব্যে কবি কাব্য সমৃদ্ধিতে অবগাহন করেছেন। এখনো তো বৃষ্টি পড়ে পুরান টিনের চালে? জমা আছে দুপুর আমার লাল পেয়ারার ডালে...। স্তবকগুলো নিঃসন্দেহে আমাদেরকে অন্যরকম ভাবনার জগতে অবগাহণ করায়।

বিচ্ছিন্নভাবে কবির বৃষ্টিকাব্য, বন্ধুকাব্য এবং মে দিবসের ছড়া মুঠির ভেতর আগুন ঝরে কার প্রকাশিত হয়েছে। যে কাব্যগ্রন্থগুলির রচনাশৈলী একটু ভিন্ন আঙ্গিকের। তিনটি গ্রন্থ থেকে কিছু পঙক্তি উপস্থাপন করলে তা সহজেই অনুমেয় হবে- সকাল বেলা ভাত জোটেনি ভাঙছ তবু পাথর/মালিক কি আর বুঝতে তুমি ক্ষুধায় আছ কাতর ... (মজুর/মুঠির ভেতর আগুন ঝরে কার)। আষাঢ়ে বালিকা/দিয়েছিলো তালিকা/বৃষ্টিতে ভাসাতে কিছু কিছু ভুল/শ্রাবণে বালিকা/দিয়েছিলো তালিকা/বরষায় কুড়াতে কিছু কিছু ফুল/বালিকা জানে না/বালিকা জানে না/ বালিকা জানে না/সেই ভুল, সেই ফুল/ভাসায়েছে সঙ্গোপনে/জীবনের দু’কূল। (বৃষ্টিকাব্য-৯)। করিম এখন কলেজ টিচার রহিম বর্গাচাষী/ভুলে গেছি, ভুলে গেছি ওদের সরল হাসি/হারান নাপিত চুল কাটে না বছর কুড়ি হবে/সিঁড়ির পাশের গোলাপ এখন ফুটছে রঙিন টবে ... (বন্ধুকাব্য)। 

শেখ নজরুল জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিকসহ অন্যান্য পত্রিকায় কলাম লিখছেন নিয়মিত। তার প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন ‘গল্প রাতে নাটক সকালে’ গদ্য সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন।

 

শস্য দোলে আসবে ঘরে শ্বাশতী

শীত আসছে, এখন বুঝি হেমন্ত!
বদলে যাবে অবাক রকম
মনের ভেতর সে মন তো।

বৃষ্টি ছিলো কদিন আগে
ভিজলো দারুণ পদ্মফুল
মানুষ কেবল ছাতায় হাঁটে
ভিজবে নাসে বদ্ধমূল

শস্য দোলে আসবে ঘরে শ্বাশতী
বদলে যাবে বাগান ঘিরে
আষাঢ়-পাড়ার নাসপতি

জন্ম আমার এমন দিনের মাঝখানে
তাই তো সবাই মন্দিরাতে
আশীষ জানায় পাঁচকানে।

বরং আমি অপেক্ষায় থাকি

গোলাপ ফোটা আমার কাছে তেমন জরুরী নয়, আমি কেবল অপেক্ষা করি,
অপেক্ষা করি-তোমার ঠোঁট দুটি কখন ফুটে উঠবে তাজা পাঁপড়ির সুরভীতে
অপেক্ষা করি, তোমার পায়ের ছন্দে পাতারা কখন খেলবে রোদ-বৃষ্টির যৌথ খামারে
জাম-জারুলের বনে দোয়েলের নাচে মুগ্ধ নই আমি বরং আমি দেখার অপেক্ষায় থাকি-
তোমার কলাবতী আঙুলের সামান্য ইশারায় কখন ঋতুবতী হবে শাল-মহুয়ার বন?

তোমাকে আবিস্কারের ভুলে আবিস্কার হয়েছে পেনিসিলিন
ভল্টারিন আবিস্কারের আগে নিশ্চিত আবিস্কার হতে পারতো তোমার চোখ
বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র আর একনায়কতন্ত্রের ধোয়া-ধোয়া-ছায়া তোমারই নির্লিপ্ততা
অথচ আমি এখনও বিশ্বাস করি-সরকার গঠনের চেয়ে তোমাকে গঠন সবচেয়ে জরুরী
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চেয়ে তোমার সৌন্দর্য ব্যবস্থাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সম্পাদনা।

আমি আজও বিশ্বাস করি, চাঁদের মাটি আবিস্কার হতো না যদি তোমার মাটিতে ফলতো আসমানী ধান।

তোমার দীর্ঘবেণী আবিস্কারের ভুলে আবিস্কার হয়েছে চর্যাপদের দীর্ঘ ইতিহাস
তোমার জড়োয়া আঁচলে কবিতা লিখলে নিশ্চিত নোবেল বঞ্চিত হতো গীতাঞ্জলী
সোনারগাও রাজধানী হতো না নিশ্চিত যদি সামান্য জায়গা হতো তোমার শরীরে।

আমি আজও বিশ্বাস করি হরপ্পা জনপদের চেয়ে তোমার পা দুটি হতে পারে ভীষণ লোকপ্রিয়
আমি নিশ্চিত; তুমি একটিবার দেহাচার্য হলে, আশ্চর্য হতো না- মোঘলিক তাজমহল
তোমার শরীরে আমার দাহ কিবা দহন হলে কে যেত দেখতে মিশরের পিরামিড়?
তুমি একবার প্রকাশ্য সবুজ হলে নিশ্চয়ই সমাধান হতো চার্জ-রিচার্জের বৈশ্বিক উত্তেজনার।
তোমার শরীরতন্ত্র আবিস্কার হলে নিশ্চিত পতন ঘটতো রাজতন্ত্রের পোশাকীয় আহাদ।

তোমাকে আবিস্কারের ভুলে বিপন্ন জীবন; বিশেষত কেন্দ্রাতীত নৃতাত্বিক ইতিহাসের এই আমি।

 

বুঝছি না কিছুই, কর্পোরেট নাকি করপোরাল

বিবর্ণ সকাল, বিবস্ত্র দুপুর পার করে আশ্বস্থ হলাম খামোখাই
শেষ পর্যন্ত সন্ধেটাও কর্পোরেট আগ্রাসনে গেলো
দুজন মুখোমুখি বসে উষ্ণ-উষ্ণ কফি পান করতে চেয়েছিলাম
হলো না; ঠাণ্ডা, কী ভীষণ হীম-বরফ শীতল
কফিময় কর্পোরেট ধোয়া উড়ে যাচ্ছে মহাহীম এন্টার্টিকার দিকে

শেষ পর্যন্ত গোলাপও অনড় নির্ঘুম কর্পোরেট ভোরের প্রতীক্ষায়
মাঝরাতেই ফুলে ফেঁপে হা হয়ে আছে- যেন মালিরা অপেক্ষা জানে না
কাঁচির সুচাগ্র জোড়া বাহুর কুচকুচ শব্দগুলো ধারণ করে পাঠাবে কর্পোরেট ধান্দায়

আমি বুঝছি না কিছুই, কর্পোরেট নাকি করপোরাল; কিছুই বুঝছি না-
হাইব্রীড যাত্রায় কী নাম পাবে আমাদের ভালোবাসা।

ভাবছি, শেষ পর্যন্ত তোমার জন্মনাম খুঁজে পেতে বলতে না হয়-
কর্পোরেট বেশ সুস্বাদু, আঁশযুক্ত, পুরুষমোহন- তোমার মুঠি আলগা করো।

 

 

কখনও এমন হয়নি- তুমি আছো, আমি নেই

কখনও এমন হয়নি- তুমি অপেক্ষা করে আছো
আর আমি ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারেনি তোমার শিল্পকলায়

কখনও এমন হয়নি- তুমি আগুনের জন্য দাঁড়িয়ে আছো
আর আমি প্রমিথিউসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি কামারপাড়ায়

কখনই এমন হয়নি- তোমার চাওয়াগুলো খুঁড়িয়ে হাঁটছে
আর আমি সরল পায়ে পৌঁছে গেছি চন্দ্রিমা উদ্যানে

কখনও এমন হয়নি- তুমি আছো, আমি নেই
তুমি কাঁদছো আমি হাসছি; বাঁক নিয়েছি তোমার নির্বাকে।

কখনও এমন হয়নি- তুমি যাচ্ছো, আমি ফিরছি
তোমার হাতছানিতে নূয়ে পড়েছে আমার হাত

কখনও এমন হয়নি- তুমি চেয়েছো
আর আমি 'না' বাজার থেকে ফিরছি

কখনই এমন হয়নি- তোমার লাটিম ঘুরছে, আর
আমি তার পাঁক না গুনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছি।

ভাগাভাগি চিক্কুর

ভয় ভয় খুব ভয়
শুরু হবে নিঃশ্চয়
ভোর হলে ডাকাডাকি
দুপুরের আঁকাআঁকি

ছবি ছবি চেহারায়
সন্ধ্যায় সে হারায়।

রাত-রাত কালো-কালো
পারো যদি খুব ভালো
ভয় ভয় ভালো নয়
খাটিকথা নিঃশ্চয়।

হাতছানি ভালো জানি
আধা-সিঁকি নয় কানি
ভয় ভয় আহা ভয়
ভালো নয় ভালো নয়।

লাল-লাল ঠোঁটে ঠোঁটে
নীল নীল ফুল ফোটে
ভয়-ভয় নীলা নয়
ভালোবাসা টিলা নয়।

ঘুড়ি-ঘুড়ি হাততুড়ি
এক-দুই নয় কুড়ি
রাত কুড়ি দিন কুড়ি
ভাঙে লাল নীল চুড়ি।

ভয় ভয় খুব ভয়
শুরু হলো নিঃশ্চয়।

মাঝরাতে দুই হাতে
ভার-ভার ভুঁই তাতে
ঘুম ভাঙে ভাতঘুম
চুড়িদার ঝুমঝুম।

ঝুমঝুম ভয় ভয়
মেঘ ডাকে নিঃশ্চয়।

টিকটিক টিক্কুর
ভাগাভাগি চিক্কুর
ভয় ভাঙে খুব ভয়
শেষ হলো নিঃশ্চয়।

 

এমন নবজন্মের কিছুই জানবে না তুমি



তুমুল ভিজছে শহর। সোডিয়াম বাতির চুয়ানো জলে ভিজছে রাতের কলেজিয়েট শাখা। বৃক্ষ, ফুল, পাখি আর রাতের নিঃসঙ্গ ল্যাম্পপোস্ট নিয়ে এর মধ্যে বৃষ্টিনিশিথা ছেড়ে গেছে মেঘের স্টেশন। ওদের জন্য আজ ডিনার, সাপার, বেড-টি, ব্রেকফাস্ট, টি-ব্রেক, লাঞ্চ, ব্রাঞ্চ- সবই ফ্রি; শর্ত একটাই-ভিজতে হবে পাতা ও পাপড়ির পোশাকশূন্য শরীরে।

শর্তহীন, টিকেট বিহীন জলস্নানের পরিতৃপ্তি আজ ওদের বৃন্ত ও শাখায়। ওরা ভিজছে দূরন্ত বেগে ছুটেচলা বৃষ্টিনিশিথার ছাদহীন বগিতে বগিতে। ওদের ঠোঁট থেকে বেজে উঠছে কফির কাপের টুংটাং আর পতনের চুকচাক শব্দ। উলম্ব বৃষ্টিবহরে ওদের শরীর থেকে খসে পড়ছে শহরের ক্লান্তি, মানুষের বাস্তবায়িত প্রতিশোধ।

ওদের মনে পড়ছে অনন্ত বসন্ত প্রহর, গোলাপি সকাল, রজনীগন্ধার শাদা জোছনা, পরাগ-পতঙ্গে বৈশাখী পূর্ণিমা।

তুমুল ভিজছে শহর, শ্রাবণের পারিজায়ী রাত, নয়নতারার করপোরাল পাঁপড়ি, স্বর্ণচাঁপার ধূসর বাঁকল, সবুজ ডানার টিয়ে, কিছু বৃক্ষস্বভাব প্রেম, গণিকার পুরু লিপস্টিক।

ওরা জেগে আছে আনন্দে, আর মানুষ ঘুমোচ্ছে অঘোরে। তুমিও ঠিক তাই! এমন নবজন্মের কিছুই জানবে না তুমি; বরং সকাল হলে অসুরের মতো বৃষ্টিকেই অভিশাপ দেবে।

 


হায় ইলিশ, টুকরো-টুকরো ফ্রাইড ইলিশ!



হায় ইলিশ, প্রিয় ইলিশ, সংগ্রামের ইলিশ, কবিতার ইলিশ, জাতির ইলিশ, স্বপ্নের ইলিশ-তুমি শুয়ে আছো কুচি-কুচি বরফের শাদা জোছনায়।

কী নরম, কী শীতল, কী মায়া-মায়া চোখে তাকিয়ে আছো বাঙালিপনার নিরেট সম্ভাবনায়! তোমার শুভ্র শরীরে উপুড় হয়ে আছে আমাদের উৎসবের কলস।

তোমার কী মনে পড়ে মেঘনার সঙ্গমে ডিম ছাড়তে ছাড়তে অনুভব করেছিলে ফাঁস ফাঁস জালের কঠিন বেড়াজাল? মনে কী পড়ে?- সোদাগন্ধময় মাটির বুকে কতবার লেজ নেড়েছিলে ফফিনপুরির যাত্রার আগে।

হায় ইলিশ! প্রিয় পান্তার বুকে ভাঁজি ভাঁজি ইলিশ, সর্ষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ- তুমি আবারও টক অব দ্য বাজার, টক অব দ্য ফ্ল্যাট, টক অব দ্য ড্রয়িংরুম, ট্যক অব দ্য গলিপথ, টক অব দ্য বটমূল- এ বোশেখে।

হায় ইলিশ, টুকরো-টুকরো ফ্রাইড ইলিশ; কাঁচা লংকা-পেয়াজে সংস্কৃত ইলিশ! তেল-তেল পেটি-পেটি স্বপ্নের ইলিশ! হাপুস হুপুস, আহ উহ আমজনতার আরোধ্য ইলিশ; আমি বাজারে আসছি- তোমার সঙ্গে কথা আছে।

মনগুরুত্বের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক


আমরা যৌথ জন্মান্ধের এক পতিত বারান্দায় মনগুরুত্বের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছিলাম
আমরা মিলিত হয়েছিলাম স্বপ্নের দাহকালে, ঠোঁটের দুর্দিনে; তবে কোন শান্তির প্রতিষ্ঠায় নয়
নদী আহত, পাখিরা মরছে, সাগর ফুসছে, মানুষ ভাসছে- তার কিছুই ছিল না এ বৈঠকিদিনে
যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়াতে, বিপন্ন সবুজ বাঁচাতে কিংবা পাখির খাঁচা ভাঙতে আমরা বৈঠকে বসিনি।

মৌলবাদী ধান্দাবাজ দেশদ্রোহী কেন বোমারু হয়েছে তাতে খুব বেশি আগ্রহ ছিল না আমাদের
আমাদের অনুশোচনা ছিল না কোন যুদ্ধশিশুর উড়েযাওয়া পায়ের গোড়ালি আর আহত আঙুলে
আমরা মিলিত হয়েছিলাম বিপন্ন এক বিধবার বাড়িতে; অথচ তারও কোন সুসংবাদ নিয়ে নয়!
কোথায় অন্ধ জাতিস্বর স্বপ্ন চাপকাতে দোররা হাতে নিন্মাঙ্গে দাঁড়ায় কিংবা হিল্লাবিয়ের আনন্দে-
ভাঙে যৌথ ভালোবাসা- এসব কিছুই উত্থাপিত হয়নি আমাদের এই পূর্বনির্ধারিত আলোচনায়

তবে আমরা ছিলাম ঘনঘোর আনন্দে- নিবীড় ও নিরাপদ- চা ও কফিতে, চুমু ও চামিলিতে
আমাদের চার ঠোঁটের মাঝখানে ছিল একগোছা রজনীগন্ধা, তরতাজা গোলাপের টিনএজ স্বাদ
আমাদের বৈঠকজুড়ে ছিল- তার উষ্ণতা আমার মুঠিতে আর আমার আঙুল তার নাভিমুলে;

অথচ বিদেহী একটি প্রেমের গল্প সাজাতেই আমরা এ মহান বৈঠকে মুখোমুখি বসেছিলাম।
তোমার দেখা পেলে হয়তো সহজ হয়ে যেত সব

 

মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছি আমি। বাধা দেবো তাকে, উপায় নেই আমার। এর মধ্যেই রক্তচক্ষু দেখিয়েছে দশবার। পালিয়ে যাবো? অসম্ভব! আমিও নাছোড়বান্দা। যে পায়ে একদিন আমি হেঁটে গেছি তোমার পথের রেখা ধরে- সে অসাড় আজ। আমি হাটু থেকে কোমর অবধি পড়ে আছি সেই বিছানায়-যেখানে তোমার আরেক জন্ম হয়েছিলো বৃষ্টিপ্রহরে।

আমার মৃত্যু গোলাকার নাভি ছুঁয়ে বসে আছে- নরকের সামান্য নিচে; যেখানে একদিন জেগেছিলো অসংখ্য অগ্নিগহ্বর। ভাঙনে মুক্ত জলের মতো খলখল করে বের হয়ে আসছে সদ্যজাত মীমাংসিত মৃত্যু। যার বাহু পেচিয়ে ধরেছে স্মৃতিময় আবক্ষ- যেখানে বহুদিন মাথা রেখে শুয়েছিলে তুমি।

তোমার মেহেদীরাঙা কত কত চুল ঝরেছিলো ওখানে- রাত্রির ওম ওম হিমাঙ্ক বিশ্বাসে। আজ তোমার আমন ছোঁয়া আমার সেই হাতে কত সহজে হাত রেখেছে খসখসে মৃত্যু। আমার হাতছানি কত সহজেই হয়ে গেছে মৃত্যুর আহ্বান! যে হাত ধরে তুমি হেঁটেছিলে বহু পথ; কাদামাখা ধানক্ষেত, পার হয়েছিলে পথে পথে কত বুনোফুলের সারি! আঙুলে আঙুল রেখে লিখেছিলে নির্ভুল ভালোবাসার বার্ষিক ফলাফল।

সবকিছু ভেদ করে মৃত্যু আজ ছুয়েছে আমার শুকনো ঠোঁট; চিরুনি অভিযানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আনন্দে আগলে রাখা চুমুর আস্বাদ। চমমার ফাঁকে চেয়ে আছে সবুজপোড়া বিষন্ন চোখ- অক্ষম দৃষ্টি মেলে দেখছে মৃত্যুর নিশ্চিত আগমন; অথচ একবার তোমার দেখা পেলে হয়তো সহজ হয়ে যেত সব। তবুও তোমার দেখা নেই- কত দূর থেকে যাত্রা শুরু করেছো তুমি?

 

 

এখানে খনিজেরা বিধবা হয়েছে পলি-বিবাহের আগে

 

তুমি তো যোগরাজ্যে যাবে! নিদেনপক্ষে কিংফয়সাল
ফেরার আগেই পাবে খনিজে ডক্টরেট। কি লাভ তাতে?
এখানে খনিজেরা বিধবা হয়েছে পলি-বিবাহের আগে।
সেই সে সোনার মাটিতে বর্গায় চলছে এখন কর্পুর চাষ!
নাকটা একটু বাড়াও- দেখোতো কী মৃত্যুমায়বী গন্ধ!

তোমাকে কী খামোখাই বলেছি?- পারলে মানুষ পড়ো!
এতো কঠিন গ্রন্থ পাথরেও যাবে না গড়া!

তুমি তো যোগরাজ্যে যাবে! নিদেনপক্ষে কিংফয়সাল
ফেরার আগেই পাবে খনিজে ডক্টরেট। কি লাভ তাতে?
এখানে খনিজেরা বিধবা হয়েছে পলি-বিবাহের আগে।
সেই সে সোনার মাটিতে বর্গায় চলছে এখন কর্পুর চাষ!
নাকটা একটু বাড়াও- দেখোতো কী মৃত্যুমায়বী গন্ধ!

তোমাকে কী খামোখাই বলেছি?- পারলে মানুষ পড়ো!
এতো কঠিন গ্রন্থ পাথরেও যাবে না গড়া!

 

বৃত্তহীন কেন্দ্রীয় ভালোবাসা

বৃত্তের বাইরে এসে পড়েছি বিপদে
এত বিশাল পরিসীমা ঘোরা আমার কাজ নয়
কেন্দ্রই আমার পরিপূরক, যার চেয়ে ক্ষুদ্র আমি
কেন্দ্রীয় শাসনই আমার জন্য ভালো।

ভাবতে কার না ভালো লাগে-
পেয়ারার মতো গোলাকার: নাভিতে যার এক দৌঁড়
অথচ কী ভুলই না ঘটে গেল বৃত্ত ভেদ করে
এখন কেন্দ্র ছুঁতে আমিই ঘুরছি বমবম।

উন্মুক্ত উদোম অভিভাবকহীন এই আমাকে টানছে
তাবত পৃথিবীর কেন্দ্রীয় সরকার
আমাকে টানছে মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ আমেরিকা
আমাকে সাঁতার শেখাতে চায় নিলনদ।

আমার কেন্দ্রাতীত নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস
পাললিক হৃতপিণ্ডে তারা গড়তে চায় পিরামিড।

আমাকে টানছে ফুজিয়ামার জলন্ত ঠোঁট
মক্কার উন্মুক্ত ময়দান, শয়তানের প্রতীকী শরীর
তৃতীয় বিশ্বের খুঁদ-পিপাসার বৃত্ত বিচ্ছিন্ন মডেল
আমি আমাকে টানছে মিসেল ওবামা।

ম্যাডোনার জমকালো স্টেজে মডেল সাজাতে
আমার ঝুঁটি ধরে চলছে তুমুল টানাটানি
আমাকে টানছে সালভাদরের তুলি, পাবলোর ক্যানভাস-
সোফিয়া লরেনের অতৃপ্ত জীবন।

বিপন্ন নদী, বিধ্বস্ত সবুজ
বিদীর্ণ দিগন্তের মডেল আমি
আমাকে টানছে হিম এন্টার্কটিকা
বৃত্তের বাইরে এসে বিপন্ন আমি!

এত বিশাল পরিসীমায় হাঁটার সাহস ব্রহ্মারও ছিল না।

 

খণ্ড খণ্ড অখণ্ড

বেশ তো ছিলাম একা
একাকী দিনে, একাকী রাতে
বৃষ্টির আগে পরিশ্রান্ত মেঘের মতো
জলতরঙ্গের আগে নিঃসঙ্গ জলের মতো
একাকী মেঘে, একাকী ফোটায়

বেশ তো ছিলাম একা
অনির্বাচিত চুমুকাল শেষে
শ্রমিক ঠোঁটের বিনীত জিজ্ঞাসায়
দারুচিনির অনামিকা ভাঙার আগে
জলজ জিহ্বায়

বেশ তো ছিলাম একা
রাত্রি মৈথুনের ফর্সা কবিতায়
নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের শতভাগ চক্রসুদে
ব্যাংক ও বীমার গোপন রহস্যে।

বেশ তো ছিলাম
আত্ম সংগমের গোপন আনন্দে
বাথট্যাবের কামুক জলে
উপুড় শরীরে তোশক তোষণে।

অথচ এখন খণ্ড খণ্ড অখণ্ড সেই একাকী
সেই একাকী হঠাৎ দাঁড়িয়েছে
শহরের যাবতীয় মুদির মোড়কে।
সেই একাকী ঘিরে সহস্র চোখ-
দেখছে প্যান্টে, শাড়িতে, কামিজে
এখন একাকী দিন নেই,
একাকী রাত নেই, একাকী তুমি নেই
একাকী ভোর ব্যস্ত ভীষণ!

এখন শুকনো জলের কল থেকে
জলজের স্খলন চলছে অবিরাম।

তবুও জন্মেছিলে তুমি

 

বছর বছর বেঁচে আছি
তবুও জন্মদিন আসে, কী আশ্চর্য!
তোমাকে ডাকছি, বলছো- হ্যাঁ
তোমাকে ডাকছি, বলছো- না।

তোমাকে ছুঁতে চাই- ঠোঁট বাঁকাও
তোমাকে ছুঁতে চাই- চোখ বন্ধ করো।

আমি মরে যাবো, অথচ জন্মদিন থাকবে
আমি বিগত হবো, তবু জন্মদিন আসবে
বয়স বাড়বে আমার, বয়স জাগবে তোমার
একশ’ তম জন্মদিনে ফুটবে একশ’ গোলাপ;

কী আশ্চর্য! গোলাপের কোন জন্মদিন নেই।

বছর বছর বেঁচে আছি
তবুও জন্মদিন আসে, কী আশ্চর্য!
মাঝখানে শিমুল পলাশের দিন চলে যায়
অশ্বথ ছায়ায় জিরান জমায় মাথালী পয়গম্বর
জন্মদিন পালন হবে না তার-
যার ছায়ায় বাড়ছি আমি; কী আশ্চর্য!

সারিবদ্ধ কাক বসে সজনের ডালে
তাদের জন্ম ঠোকরায় আমার জন্মান্তরের কোনা-কানচা
ছোট্ট খুপড়ি থেকে ফুড়ুত- উড়ে যায় বিরহী চড়ুই
ডিমের খোলস ভাঙার গল্প মনে নেই যার! কী আশ্চর্য!

বছর বছর বেঁচে থাকা
তবুও জন্মদিন আসে, কী আশ্চর্য!
কারো ভালো লাগে, কারো লাগেই না
কেউ জানায় শুভেচ্ছা; কেউ করে বিরক্তি প্রকাশ;

তবুও জন্মেছিলাম আমি, কী আশ্চর্য!
তবুও জন্মেছিলে তুমি, কী আশ্চর্য!!

 

 

কেন দিয়েছিলে হৃদয়?

 

কেন দিয়েছিলে হৃদয়?
কী কাজ তার শেখালে না প্রভূ

কেন দিয়েছিলে চোখ
কিছুই হলো না দেখা-কেবলই অন্ধকার

কেন দিয়েছিলে বাহু, জোড়জোড় হাত
আরও কিছু-অনামিকার রঙে প্রণয়পাথর

কেন দিয়েছিলে হাসি, ফাঁসির মতো ঝুলঝুলে-
দাহের আগুনে গেলো জীবন

কেন দিয়েছিলে আত্মা-ছোট্ট খাঁচায়
পারলো না উড়তে, পারে না লাফাতে

তারপর কী হবে? কিছুই জানালে না প্রভূ

কেন দিলে এতোটা অধর? শুধু কী বলার দায়ে
কী কথা অন্য ভাষায়, কিছুই শেখালে না প্রভূ

দিয়েছো উষ্ণতা-গাঢ়লাল
দিয়েছো যৌবন তারও বেশি
শৈশবে হামাগুড়ি, হাটুভাঙা দৌঁড়-দৌঁড়
দৌঁড়াই প্রভূ, কেবলই দৌঁড়াই, আহা রে দৌঁড়!

কোথায় যেতে হবে কিছুই তো জানি না প্রভূ।

 

আমার জন্য একটু থাকো

 

আমার জন্য
একটু থাকো
সারা সকাল
দুপুর তো নয়
সন্ধেবেলার
ব্যস্ত ফেরায়
একটুও নয়,

একটু থাকো
যখন খুশি
একটু থাকো
যেমন খুশি,
চোখের দেখায়,
হাত এগিয়ে
হাত গুছিয়ে

যেমন খুশি
চলার পথে
হাঁটার ফাঁকে
দৌঁড় জমিয়ে
না হোক ফেরা
একটু কেবল
পাতায় পাতায়
ধুলোর সঙ্গে
আদর মাখো,
না হোক মাখা

সবুজ ঘাসের
ডগায় ডগায়
শিশির ভাঙার
কষ্টগুলো
থাক না পড়ে

কী এসে যায়?
কী আর হবে?
কার কী হবে?
কোথায় হবে?
কী-ই বা হবে?

আমার জন্য
একটু না হয়
সময় দিলে,
যখন খুশি,
হোক না আষাঢ়
থাক না শ্রাবণ,
হোক না শীতের
জীর্ণ রাতে,
থাক না ঝড়ের
ব্যস্তডানা

নদী না হয়
ভাসাক চিঠি,
পাহাড় না হয়
পাথর বুকে
থাকলো অনড়

কী হবে আর!
কার কী হবে?
আমার জন্য
সময় কেনার
হাট ভেঙেযায়

অচল সিঁকি
ঘুরতে থাকে
পথ হারানো
খুকির হাতে?
লাটিম খোঁজা
খোকার চোখে

ঘুরে ঘুরে
আবার জমে
পানের বোটায়
চুন লাগিয়ে
বটের ছায়ায়
পিকপিচুটি

তখন না হয়
একটু দেখো,
চালচুলোতে
বয়স পোড়ে!
তখন না হয়
একটু পোড়ো

আমার জন্য
একটু কাঁদো,
কে কাঁদে না
বলতে পারো?

সকাল কাঁদে
দুপুর কাঁদে
বিকেলগুলো
না কেঁদে কী
সন্ধ্যা নামে,
রাত্রি কী আর
কান্না ছাড়া
কলস ভাঙে?

আমার জন্য
একটু রাখো
কান্না বুনে,
গোলাপ না হোক
কষ্ট কিছু
উঠবে ফুড়ে

আমার জন্য
একটু থাকো,
যাবার পথে
না হোক দেখা
ফেরার পথে
না হও একা।

 

হাতটা ধরে রাখো, অন্যেরা নিয়ে যাবে

 

হাতটা ধরে রাখো
হাতটা ধরে রাখো
শূন্যতা গিলে খাবে
অন্যেরা নিয়ে যাবে।

আমার সাধ্য নেই
আমার শক্তি নেই
আমার আদ্য নেই
আমার থাদ্য নেই।

মাছিরা উড়িয়ে নেবে
মাছেরা কুড়িয়ে নেবে
গাছেরা মুড়িয়ে নেবে
ফুলেরা গুড়িয়ে দেবে।

আলগা দাঁড়িয়ে থাকি
দু হাত বাড়িয়ে থাকি
মুখটা হারিয়ে আঁকি
আকাশে তাড়িয়ে পাখি

আমার বন্ধু নেই
আমার স্বজন নেই
তুমিই মাথাল হও
চাতালে পাতাল হও।

আমার মৃত্তিকা নেই
আমার শস্য নেই
আমার খাদ্য নেই
আমার সাধ্য নেই

তুমিই সকাল হও
তুমিই দুপুর হও
তুমিই রাত্রি হও
তুমিই জেগে থাকো
তুমিই যাত্রি হও।

হাতটা ধরে রাখো
হাতটা বেধে রাখো

আমাকে স্বপ্ন দাও
আমাকে শস্য দাও
আমাকে সম্বৃদ্ধি দাও

হাতটা ধরে রাখো
দু চোখ ছুঁয়ে থাকো
ঠোঁটের ভাষা দাও
একটু নুয়ে থাকো।

আজ আমার ‌প্রথম মৃত্যুউতসব

 

আজ আমি পালন করছি তোমার প্রথম জন্মদিন
তুমি আছো কী নেই; কী জানি? জানি না কিছুই
তবু তোমার হাসিতে ভাসছে মরাকাটালের ঠোঁট
ভাবো তো কত বছর পর ফিরে এলো প্রথম শৈশব!

আজ একটিমাত্র দায়িত্ব আমার- চামেলী সন্তরণ
সাঁতারের ফাঁকে ফাঁকে দেখছি যুদ্ধবাজ পৃথিবীর হাসি
নতুন পালকে লিখেরাখা পখিদের প্রণয়-উপাখ্যান
মাছেরাও সাঁতার জানে তাও জেনেছি এতদিন পর!

আজ তোমার জন্মদিন-তারিখের কথা বলছি না আমি
জন্মেছিলে কী-না? তারও সন্দেহ থাক বদদের মনে
হতেও পারে এ সব ভুল জানাজানি, সাজানো গল্পের নখ
তবু কিছুই হবে এর-ওর গভীর আঁচড়ে,
আজ আমার প্রথম ‌মৃত্যুউৎসব।

 

কী সোন্দর!

 

মেধাবী স্কুল শিক্ষক নূরুল ইসলাম কোনদিনই কবিতা লেখেননি
নিজের বাগান থেকে কখনই ছেঁড়েননি তাজা কোন গোলাপকলি
শ্যাম্পুতে তার ঝাকড়া চুল ব্যাকব্রাশে পরিপাটি দেখে নাই কেউ।

তিনি পরতেন ঢোলা পাজামা, ভাঁজপড়া পানজাবি আর হাউয়াই চপ্পল
এমনি হাওয়ায় হাওয়ায় ভেতরের পথে স্বাগত হয়েছিল তার সুবর্ণ যৌবন
পিতামহ বলেছিলেন- একজন লক্ষ্ণী বৌমা ঘরে আনতে চাই রে নুরুল!
বাবা প্রশ্নহীন থেকে স্বহাস্যে পালকিতে চড়ে বসলেন বিনম্র লজ্জায়-
কিছুই না জেনেÑ কোথায় গন্তব্য, কোন সে মুখ? লক্ষ্ণী না স্বরস্বতী!
সেই প্রশ্নহীন অজানা ঘোমটার আড়ালে যিনি ছিলেন- তিনিই আমার মা।

নতুন দিনের প্রথম প্রহর থেকে যিনি ঘরবারান্দা উনুন রেখেছেন পরিপাটি
আনকোরা দুই কাঁখে দূরের পুকুর থেকে জল এনেছেন নতুন কলসি ভরে
উনুনের মুখে ফুঁক দিয়ে ভেজা ভেজা চোখে রান্না করেছেন তিনবেলা
ভালোবাসার চাঁদর মুড়িয়ে আগলে রেখেছেন আমাদের শৈশব-কৈশোর।

একদিন যৌবনের হাত ধরে সেই আমরাই ভালোবাসার পথে পা বাড়ালাম
তারপর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে পরস্পরের চোখের ভাষায় শিখলাম শুদ্ধ নামতা
সবকিছু ছিল আলোতারায়; তবু শেষ থেকে খুনসুঁটি ছাড়া প্রাপ্তির খাতা শূন্য!

আমাদের ভালোবাসার পারিপার্শ্বিক শব্দগুলো কী ভীষণ ক্ষীণস্বরে উচ্চারিত
জীবন থেকে জীবনে প্রবাহিত হবার আগেই জলোচ্ছ্বাসে ভাসে তার শরীর
অথচ সেদিন অচেনা মেয়ের ঘোমটা সরিয়েই বাবা বলেছিলেন- কী সোন্দর!

শুধু আমার বাবা নয়; কী সোন্দর শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে অনেক বাবার মুখে
আজও সেই সব মায়ের জন্য মা ছাড়া অন্য কোন উপমা উতপ্রেক্ষা যথেষ্ট নয়।

মেধাবী স্কুল শিক্ষক প্রয়াত নূরুল ইসলাম কোনদিন একচ্ছত্র কবিতা লেখেননি
তার ছিল কাব্যহীন কারবারি তবু ভালোবাসা উচ্চারণে বলতেন- কী সোন্দর!
অথচ আজও আমার অসংখ্য কবিতায় বাবার সেই প্রিয় বাক্যটি লেখা হয়নি।

ঠোঁটটি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত হয়নি তোমার

 

ঠোঁটটি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত হয়নি তোমার
ওখানেই গভীর লাল গোলক ছিলো পতাকার
একটু কেবল চেয়েছি যেখানে স্বাধীন হতে সবুজে।

এই মাটির অধরে কত যে দিয়েছি হামাগুড়ি
হাঁটতে চেয়েছি তাঁর ভাঁজভাঙা ইতিহাসে
কখন যে ভূগোল বিভ্রমে ফুরিয়েছে আয়ুষ্কাল
কিছুই হলো না জানা বিজয়ের পাঠ্যক্রমে।

ঠোঁটটি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত হয়নি তোমার
এমন মধ্যরাতে মিলছে না বীজের ধারাপাত
যেখানে মুক হয়ে আছে বিরোচিত শস্যপ্রপাত।

 

একটি প্রক্রিয়াজাত তদন্তরিপোর্ট এবং কাঠের হাতুড়ি


একজন জন্মান্ধ
ঘটনাটির বিশেষ দর্শক ছিলেন
তার অন্ধ দুচোখ হঠাত খুলে গিয়েছিলো
চিনচেনা এক নারীচিতকারে
সাক্ষ্য দিতে তিনি নিজেই দাঁড়িয়েছিলেন
বিজ্ঞ আদালতের কাঠগড়ায়
অথচ অন্তর দিয়ে দেখার বিষয়টি
সাক্ষ্য হিসেবে আদালতের বিবেচ্য নয়
সুতরাং দৃষ্টিবান মানুষের হাততালির ভিড়ে
তিনি কাঠগড়া থেকে নেমে গিয়েছিলেন।

একজন মুক-বধির ছিলেন
এই মর্মস্পর্শী ঘটনার আরেক সরাসরি দর্শক
তিনিও এসেছিলেন মহামান্য আদালতে
কিন্তু লিখে জানাতে পারলেন না ঘটনার একটিও মুহূর্ত
সঙ্গত কারণে বিষয়টি আদালতের নজর কাড়েনি
সুতরাং তিনিও বিড়বিড় করে নেমে গিয়েছিলেন।

একজন ভিক্ষুক দেখেছিলেন
চিতকারদীর্ঘ আত্মরার মধ্যসময়
কিন্তু তিনি ছিলেন ঘড়িহীন
আদালত তাকে প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন,
সময়টা কখন? সেটিই বলুন
তিনি হাত আর আঙুল দিয়ে
সূর্যের শরীর মাপতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন
কিন্তু সূর্যের দৈর্ঘ-প্রস্থ আদলতের বিবেচ্য নয়
তাই ঝুলিটা কাঁধে ঝুলিয়ে তিনি প্রস্থান করেছিলেন।

ঘটনাটা ঘটেছে ঝোঁপের আড়ালে, সূর্যালোকে
বুনোঘাস আর শুকনো কিছু পাতার শরীর ছুঁয়ে
সেইসব ঘাস, পাতা গত রাতের একপশলা বৃষ্টিতেই
ভুলে গেছে তাদের মাড়ানো সময়
যে সাক্ষ্য পয়েন্টআউট করতে আগ্রহী হননি
বিজ্ঞ আদালত।

কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে
ঘটনা নিজেই আদালতে উন্মুক্ত।

একদল কাক তখন কা-কা স্বরে
অবিরাম প্রতিবাদ করেছিলো
দুটি কুকুর তাদের বৈষয়িক আনন্দ ভুলে
ঘেউ ঘেউ ঘেউ শব্দে চারপাশ কাঁপিয়েছিল
তখন ঝোঁপের আড়ালে দুটি দোলেল
এপাশ ওপাশ উড়তে উড়তে পাখা ভেঙেছিলো।

আর মেয়েটি তো বলছেই,
মহামান্য আদালত, ঘটনাটি আমার সঙ্গেই আছে।

কিন্তু একটি প্রক্রিয়াজাত তদন্তরিপোর্ট
আর একটি কাঠের হাতুড়ি ছাড়া
মহামান্য আদালতের সামনে কিছুই নেই।

 

আজ ভীষণ জ্বর-জ্বর মনে হচ্ছে

 

ভালোবাসতে-বাসতে-বাসতে ফতুড় করে দেবো -
ভীষণ, ভীষণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতো-প্রিয় কবি-বন্ধু
আজ সে নেই, বেচারা! কালই মরেছে সামান্য জ্বরে
যে জ্বরে হয় না কিছুই, কিছুই হয় না-মাধবী-লতার
বরং দুলে ওঠে, দুলে ওঠে, দুলে ওঠে-যে কোন বাতাসে।

ভালো বাসতে বাসতে ফতুড় করতে পারেনি-বন্ধু-কবি
ফতুড় তো নয়ই; আমৃত্যু ছুঁতেই পারেনি মাধবীর একটিও আঙুল
ও মরেছে সামান্য জ্বরে, আমারও আজ ভীষণ জ্বর-জ্বর মনে হচ্ছে।

 

বারবার পলাতক পাখিটি খুঁজতে ভালো লাগে না

অবশেষে খাঁচাটা কিনতেই হলো। বারবার পলাতক পাখিটি খুঁজতে ভালো লাগে না। গমন সুনিশ্চিত হলে এই খাঁচাটিই হতে পারতো মস্ত দূয়ার! তবু পাখি ফিরে আসে, ছোয়ার ওপাশে তাকিয়ে থাকে না ছোয়ার নিশ্চিত বিশ্বাসে।

পাখি ফিরে আসে; আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি; পাখি ফিরে আসে- আমি পুরাতন পালক হাতড়াই। বহুদিন খুঁটে খুঁটে তুলেরাখা জন্মপালকগুলো নিয়ে যায় পাখি। পাখি ফিরে আসে পালক নিয়ে যায়, পাখি ফিরে আসে ওড়ার মহড়া দেখায়। যে আমি এতোদিন গোপন রেখেছি তার উড়তে শেখার কৌশল; সেই আমিই আজ প্রত্যায়ন করছি, পাখিটি উড়তে পারে নিজস্ব ডানায়। আমি স্বীকার করছি, আমি স্বাক্ষর দিচ্ছি, ভালোবাসা কেবল খাঁচার নিরাপত্তায় বাঁচে না।

আমি ভালোবাসার এক সদস্যের তদন্ত রিপোর্টে এই প্রথম প্রকাশ করলাম, সবশেষ কেনা খাঁচাটা পাখির জন্য ছিলো না, বরং ছিলো- আমার জন্য আমারই বিশেষ উপহার।

 

সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?

সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?
যে তুমি রাহেলা হয়ে ওঠো, চামেলিও হতে পারো
ঘর-বাড়ি, জলা-জংলা, সংসার হতে পারো
সহজেই হতে পারো শহুরে জমির খাজনার আপডেট
সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?

তুমি ফসলের মাঠে রাক্তাক্ত যুদ্ধ হতে পারো
পলিথিনের অভেদ্য স্তর সাজাতে নদীঘাতক হতে পারো
তুমি জটকা নিধনের দুর্বোধ্য জাল বিছাতে পারো
সহজেই হতে পারো চালের আড়তের ধূর্ত মহাজন
সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?

তুমি পাখির শরীরে রাতের অনায়াসগম্য ক্ষুধা হতে পারো
পারুল বোনের জন্য টানটান জিহ্বায় লালা ঝরাতে পারো
তুমি আম কাঁঠালের বন থেকে দোয়েল তাড়াতে পারো
সহজেই রপ্ত করতে পারো ঘুঘু শিকারের আধুনিক কৌশল
সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?

তুমি বাহান্ন, উণসত্তর কিংবা একাত্তর হতে পারো
সাতই মার্চের ভাষণ শুনতে শুনতে বিদ্রোহী হতে পারো
তুমি অপারেশন সার্চ লাইট কিংবা বুদ্ধিজীবী হত্যাদিবস হতে পারো
যে তুমি সহজেই আলোড়িত হতে পারো পতাকা খোঁচিত সফেদ পোশাকে
সেই তুমি বাংলাদেশ হলে না কেন?

 

তোমায় ভালোবাসা জানাতে একটিমাত্র মিনিট খরচ করেছি আমি

 

তোমায় ভালোবাসা জানাতে একটিমাত্র মিনিট খরচ করেছি আমি। বিনম্র উচ্চারণে সেই এক মিনিটেই বলেছি তোমায়-ভীষণ ভালোবাসি। মাত্র একটি মিনিট তবু কত গভীর শান্ত মুগ্ধতা ভরেছিলো আসন্ন সন্ধ্যার ক্লান্তডানায়!-সেখানে ছিলো না কোন রক্তক্ষরণ; ছিলো না কোন দ্বিধা; ছিলো না সামান্য পিছুটান।

তোমায় ভালোবাসা জানাতে প্রস্তুতিহীন একটি মিনিট অতিক্রম করেছিলো পৃথিবী। তোমায় ভালোবাসা জানাতে ঘড়ির ঘোমটায় লাল হয়েছিলো-ষাটটি সেকেন্ড। জীবনের সবশেষ অংক মিলুক না মিলুক তবু বলেছিলাম-ভীষণ, ভীষণ ভালোবাসি তোমাকে। তুমিও স্বেচ্ছায় বিস্তর আলোড়নে মেখেছিলে প্রসন্ন প্রতিশ্রুতির নির্লোভ চুম্বন। মাত্র এক মিনিটে উচ্চারিত-তোমায় ভালোবাসি, তোমায় ভালোবাসি-হঠাৎ বয়ে এনেছিলো বারবার পরাজিত কোন সাঁতারুর প্রথম জলীয় স্বাদ; মাত্র এক মিনিটে-খাঁচায় পোষা টিয়েটাও শিখেছিলো প্রথম উচ্চারণ-শুভসকাল। মাত্র এক মিনিটেই আমার সমস্ত জীবনের সমান-সমান উচ্চারিত হয়েছিলো-ভালোবাসি, ভালোবাসি।

তখন থমকে দাঁড়িয়েছিলো নদী, জলের ধারায় জেগেছিলো যৌবন; তখন শাপলা-শালুক থেকে বেজেছিলো-‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ তখন কবিতার অসংখ্য শব্দ, কোলন, ড্যাস, সেমিকোলন কিংবা বিস্ময়ের বিস্ফারিত পাখায় উড়েছিলো-দোয়েলের স্তবক। তোমায় ভালোবাসি বলতেই- সেই এক মিনিটে বিষন্ন সকালটা হঠাৎ দুপুরোত্তম হয়েছিলো। দুপুরের আমন্ত্রণে ছুটে এসেছিলো গোধুলিরাঙানো বিকেলের অনুলিপি। তোমায় ভালোবাসি বলতেই-বিকেল এসে একপায়ে দাঁড়িয়েছিলো আমাদের দুজনের চারহাত ছুঁয়ে। এক মিনিটেই ধোয়াওঠা কফির স্তনে শেষ চুমুকটি হঠাৎই হয়েছিল নিঃশেষ। তখন কাপের টুংটাংয়ে বেজেছিলো পিতলঘন্টা-দেখেছিলো বুক ভরানো দিঘির কলসিজল-তখন এক মিনিটের তুমি-আমি বেজেছিলাম হাজার ঘন্টায়-ঢং-ঢং-চুক-চুক।

অথচ আজও ভাবতে অবাক লাগে, তোমায় ভালোবাসি চুরি হয়েছিলো, তোমায় ভালোবাসি পড়েছিলো-সামরিক বুটের নিচে; আর আমি তাকে মাত্র এক মিনিটেই তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম অনাবিল ভালোবাসার অনাগত আগামীকাল। তারপর ফিরে যেতে যেতে ভাবি-ভালোবাসার এমন শব্দগুলো, এমন স্বপ্নগুলো-আমাদের জন্য, কেবল আমাদের ভালোবাসার উচ্চারণে-হাজার বুকের তাজারক্তে ভেসেছিলো প্রাণের বর্ণমালা।

 

কে না জানে ডান পাশের ব্যথায় ভালোবাসা থাকে না

 

স্বপ্নগুলো ছোট না হলে যা হয়- আমারও ঠিক তাই
আমি আজও বালকের মতো ফড়িংয়ের পিছে ছুটি
এখানেই ভীষণ ভুল হয়; ফড়িংয়েরা ঘাসে মিশে যায়
আর আমি মাটি-মাটি চিৎকার করি-এতটাই বিপরীত!

পাগল ছাড়া আগুল কেটে তোমার নাম লিখবো কেন
বুকের দু পাশেই ছুরি চালিয়ে খুঁজবো কেন হৃৎপিণ্ড
কে না জানে ডান পাশের ব্যথায় ভালোবাসা থাকে না

মরতে যদি হয় বামপাশের ব্যথা নিয়েই মরতে চাই
সমস্যা একটাই- বাম খুঁজলেই ডানটা বড্ড চোখ রাঙায়।

 

 

গোলাপ বেলিতে বিরহ ঠেলিতে হাসিতে খেলিতে

 

গড়িয়ে গড়িয়ে
নিয়েছে জড়িয়ে
কতটা ছড়িয়ে
বাঁচা।

হায় ঈশ্বর!
কোন পথে ঘর?
দিলে তুমি গড়ে
বড় নড়বড়ে
খাঁচা।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
পাগল তাড়িয়ে
নিজেকে নাড়িয়ে
শিকড় হারিয়ে
ভাঙা ।

পাথর শানিয়ে
কাঠের পা নিয়ে
তাকে না জানিয়ে
রাঙা।

মধ্য দুপুরে
কান্ত নূপুরে
টাপুর টুপুরে
বাজা।

গভীর ভেতরে
নাড়াবে কে তোরে
ভাবে না যে তোরে
রাজা।

গোলাপ বেলিতে
বিরহ ঠেলিতে
হাসিতে খেলিতে
ফোটে।

কোথাও চাঁদোয়া
থাকে কি না ধোয়া
যখন লাগোয়া
ঠোঁটে?

হায় ঈশ্বর!
বুকে কেন ঝড়
দিলে তুমি তুলে
ভালোবাসা ভুলে
মোড়া।

নীরবে দাঁড়িয়ে
পাপোশ বাড়িয়ে
অপ্রেম তাড়িয়ে
খোড়া।